স্ট্রোক হয় তখনই, যখন মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর পেছনে মূল কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, অতিরিক্ত ওজন, আর বংশগত সমস্যা। মস্তিষ্কে অক্সিজেন না পৌঁছালে কোষগুলো মারা যায়, আর তখনই ঘটে স্ট্রোক।
স্ট্রোক! নামটা শুনলেই কেমন যেন গা ছমছম করে, তাই না? স্ট্রোক একটা ভয়ংকর রোগ। হঠাৎ হয়, কিন্তু রেখে যায় সারা জীবনের ছাপ। কেউ কথা বলতে পারে না, কেউ চলতে পারে না, এবং কেউ নিজের দেহিক কাজ ও করতে পারে না, পুরোপুরি শয্যাশাহে হয় ।
এখন প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় দুই থেকে আড়াই লক্ষ মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, according to a Facebook post from a health organization। এর ৮০% প্রতিরোধযোগ্য।
এই আর্টিকেলে আপনি জানবেন—স্ট্রোক কী, স্ট্রোক কি কারনে হয়, কার ঝুঁকি বেশি, আর কী করলে আপনি নিজে ও পরিবারকে বাঁচাতে পারবেন। আপনার বাবার, মায়ের, বা আত্মীয়ের স্ট্রোকের ঝুঁকি আছে কি? আজই জানুন, সুরক্ষা নিন।
স্ট্রোক কী? (What is Stroke?)
আমাদের মস্তিষ্ক সব কাজের প্রধান কেন্দ্র। কথা, চলাফেরা, স্মৃতি—সব এখানেই তৈরি হয়।
রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে অক্সিজেন ও পুষ্টি যায়। কিন্তু যদি হঠাৎ কোনও রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায়, বা ফেটে যায়, তাহলে মস্তিষ্কের কিছু অংশে রক্ত পৌঁছায় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষ পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা মৃত্যু বরণ করতে পারে। এটাই হলো স্ট্রোক (Brain Attack)।
ডা. মো. আমিনুল ইসলাম (নিউরো-মেডিসিন, ঢাকা মেডিকেল): “স্ট্রোকের ৭০% রোগী নিয়ম মেনে চললে আগে থেকেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।”
স্ট্রোকের প্রকারভেদ
স্ট্রোক মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে:
- ইস্কেমিক স্ট্রোক: যখন মস্তিষ্কের রক্তনালী কোনো কারণে বন্ধ হয়ে যায়। যেমন, রক্ত জমাট বেঁধে গেলে এটা হতে পারে।
- হেমোরেজিক স্ট্রোক: যখন মস্তিষ্কের রক্তনালী ছিঁড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয়।
তাছাড়া ট্রান্সিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক (TIA), যাকে মিনি স্ট্রোক বলে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এটি সাময়িক হলেও বড় স্ট্রোকের পূর্বাভাস হতে পারে।
স্ট্রোক কি কারনে হয়? স্ট্রোকের প্রধান কারণগুলো
বাংলাদেশে স্ট্রোকের জন্যে মৃত্যুর একটি অন্যতম প্রধান কারণ, according to a study published by the National Institutes of Health (NIH)।
স্ট্রোকের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে কিছু কারণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যেগুলো আমাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত। চলুন, সেই কারণগুলো একটু বিস্তারিত জেনে নেই:
- উচ্চ রক্তচাপ (High Blood Pressure)
বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি মানুষ হাই ব্লাড প্রেসারে ভোগে। উচ্চ রক্তচাপ স্ট্রোকের সবচেয়ে বড় কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। যখন আপনার রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তখন রক্তনালীর দেয়ালের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এমনটা চলতে থাকলে রক্তনালী দুর্বল হয়ে যায় এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
উচ্চ রক্তচাপ কিভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়?
- রক্তনালী দুর্বল করে দেয়।
- রক্তনালীতে ব্লক তৈরি করে।
- রক্তনালী ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ায়।
- উচ্চ কোলেস্টেরল (High Cholesterol)
রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে তা রক্তনালীর ভেতরে জমা হতে শুরু করে। এর ফলে রক্তনালী সরু হয়ে যায় এবং রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস।
কোলেস্টেরল কিভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়? রক্তনালীতে প্লাক তৈরি করে রক্ত চলাচল কমিয়ে দেয়। প্লাক ছিঁড়ে গিয়ে রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্য করে, যা স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
- ডায়াবেটিস (Diabetes)
ডায়াবেটিস শুধু রক্তের শর্করা বাড়ায় না, এটি রক্তনালীকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। ডায়াবেটিসের কারণে রক্তনালীগুলো শক্ত হয়ে যায় এবং সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ডায়াবেটিস রক্তনালীকে দুর্বল করে তোলে। রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বাড়ায়। উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়ায়।
- ধূমপান (Smoking)
ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এটা তো সবাই জানে। কিন্তু ধূমপান কিভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়, সেটা কি জানেন? ধূমপান রক্তনালীকে সরু করে দেয়, রক্তচাপ বাড়ায় এবং রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বাড়ায়।
ধূমপান রক্তে কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বাড়ায়, যা মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। ধূমপান করলে স্ট্রোকের ঝুঁকি ৪ গুণ বেড়ে যায়।
- অতিরিক্ত ওজন (Obesity)
অতিরিক্ত ওজন অনেক রোগের কারণ হতে পারে, তার মধ্যে স্ট্রোকও একটি। অতিরিক্ত ওজনের কারণে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও উচ্চ কোলেস্টেরলের ঝুঁকি বাড়ে, যা সরাসরি স্ট্রোকের কারণ হতে পারে।
- অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (Atrial Fibrillation)
অনিয়মিত হৃদস্পন্দন বা অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন একটি হৃদরোগ, যেখানে হৃদস্পন্দন অনিয়মিত হয়ে যায়। এর ফলে হৃদপিণ্ডে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বাড়ে, যা মস্তিষ্কে গিয়ে স্ট্রোক ঘটাতে পারে।
- অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন (Excessive Alcohol Consumption)
অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন লিভারের ক্ষতি করে, রক্তচাপ বাড়ায় এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়। পরিমিত অ্যালকোহল সেবন হয়তো কিছুটা নিরাপদ, কিন্তু অতিরিক্ত সেবন কখনোই ভালো নয়।
- বংশগত কারণ (Family History)
যদি আপনার পরিবারের কারো স্ট্রোক হয়ে থাকে, তাহলে আপনারও স্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। বংশগত কারণে কিছু মানুষের রক্তনালী দুর্বল থাকে, যা স্ট্রোকের কারণ হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বংশগত হতে পারে।
- বয়স (Age)
বয়স বাড়ার সাথে সাথে স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়ে। কারণ বয়সের সাথে সাথে রক্তনালীগুলো দুর্বল হয়ে যায় এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।
- জাতি (Ethnicity)
কিছু জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি দেখা যায়। এর কারণ হতে পারে তাদের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস ও বংশগত বৈশিষ্ট্য।
কারা বেশি স্ট্রোকের ঝুঁকিতে?
- বয়স ৫০+
- যারা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করেন না
- ডায়াবেটিসে ভোগেন
- ধূমপান করেন
- রাতে ঠিকমতো ঘুমান না
- ফাস্ট ফুড বেশি খান
- অনিয়মিত জীবনযাপন
এমনকি ১৫ বছর বয়সী কিশোরও স্ট্রোকে মারা গেছে।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন এনে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো
স্ট্রোকের অনেক কারণের মধ্যে কিছু কারণ আছে, যেগুলো আমরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। আসুন, সেই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করি:
- নিয়মিত ব্যায়াম (Regular Exercise): নিয়মিত ব্যায়াম করলে শরীর সুস্থ থাকে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমে, কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম করা উচিত।
- স্বাস্থ্যকর খাবার (Healthy Diet): স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম উপায়। ফল, সবজি, শস্য এবং কম চর্বিযুক্ত খাবার আপনার খাদ্য তালিকায় যোগ করুন। লবণ ও চিনি কম খান।
স্বাস্থ্যকর খাবার কিভাবে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়?
- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়।
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়।
- ধূমপান পরিহার (Quit Smoking): ধূমপান ত্যাগ করা স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর জন্য খুবই জরুরি। ধূমপান ছাড়ার কয়েক বছরের মধ্যেই আপনার স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
- অ্যালকোহল পরিহার (Avoid Alcohol): অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন পরিহার করা উচিত। পরিমিত পরিমাণে পান করাও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অ্যালকোহল রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে। লিভারের কার্যকারিতা ঠিক রাখে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।
- নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা (Regular Health Checkup): নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানোর জন্য জরুরি। এর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
- মানসিক চাপ কমানো (Reduce Stress): মানসিক চাপ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যোগা, মেডিটেশন বা শখের কাজ করার মাধ্যমে মানসিক চাপ কমানো যায়।
ডা. রুবিনা আফরোজ বলেন, “প্রতি দিন সকাল ৭টায় হাঁটতে যাওয়া, রাতে ১০টায় ঘুমানো, আর দিনে তিন বেলা সুষম খাবার খেলে, স্ট্রোক প্রতিরোধ সম্ভব।”
ডাক্তারের পরামর্শ (Doctor’s Tips)
- বছরে ১ বার ব্রেইন MRI করান
- ECG ও রক্ত পরীক্ষা করান
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ খাবেন না
- স্ট্রোকের ইতিহাস থাকলে রক্ত পাতলা রাখার ওষুধ খেতে হতে পারে
স্ট্রোকের লক্ষণগুলো চেনা জরুরি
স্ট্রোকের লক্ষণগুলো জানা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। স্ট্রোকের কিছু সাধারণ লক্ষণ নিচে উল্লেখ করা হলো:
ফাস্ট (F.A.S.T) নিয়মটি মনে রাখুন:
- F – Face Drooping: মুখ হঠাৎ বেকে যাওয়া
- A – Arm Weakness: একটি হাত দুর্বল হয়ে যাওয়া
- S – Speech Difficulty: কথা জড়ানো বা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া
- T – Time to call: সময় নষ্ট না করে চিকিৎসা শুরু করা
অন্যান্য লক্ষণ:
- একপাশে শরীর অবশ হয়ে যাওয়া
- হঠাৎ দৃষ্টি ঝাপসা বা অন্ধকার
- হঠাৎ মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
যদি আপনি বা আপনার পরিচিত কেউ এই লক্ষণগুলো অনুভব করেন, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন। ৫ মিনিট সময় নষ্ট না করে জরুরি চিকিৎসা জরুরি। সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে স্ট্রোকের ক্ষতি কমানো সম্ভব।
যখনই স্ট্রোক হয়, তখন কী করবেন?
- সঙ্গে সঙ্গে রোগীকে বিছানায় শুইয়ে দিন
- মাথা একটু উঁচু করুন
- কোনও পানি বা খাবার দিবেন না
- দ্রুত হাসপাতালে নিন
- ৩ ঘণ্টার মধ্যে চিকিৎসা পেলে অনেক সময় প্রাণ বাঁচে
স্ট্রোক থেকে সেরে ওঠার উপায়
স্ট্রোক থেকে সেরে ওঠার জন্য দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা জরুরি। এরপর প্রয়োজন সঠিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া। পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় ফিজিওথেরাপি, স্পিচ থেরাপি ও অকুপেশনাল থেরাপি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব
- শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে।
- কথা বলার সমস্যা সমাধান করে।
- দৈনন্দিন কাজকর্ম স্বাভাবিকভাবে করতে সাহায্য করে।
পরিবারের ভূমিকা
স্ট্রোকের পরে রোগীর মানসিক ও শারীরিক সহায়তার জন্য পরিবারের সদস্যদের এগিয়ে আসা উচিত। তাদের সহযোগিতা ও ভালোবাসাই পারে রোগীকে দ্রুত সুস্থ করে তুলতে।
স্ট্রোক প্রতিরোধে সচেতনতা
স্ট্রোক একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা, তবে সঠিক জ্ঞান ও সচেতনতার মাধ্যমে এর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই, আসুন আমরা সবাই মিলে স্ট্রোকের সচেতনতা কার্যক্রম জানি।
- স্কুল, কলেজ ও কর্মস্থলে স্ট্রোক নিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো উচিত।
- গণমাধ্যমে স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে প্রচার করা উচিত।
- স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা উচিত।
স্ট্রোক নিয়ে কিছু সাধারণ ভুল ধারণা
আমাদের সমাজে স্ট্রোক নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। এই ভুল ধারণাগুলো দূর করা জরুরি, যাতে মানুষ সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারে।
- স্ট্রোক শুধু বয়স্কদের হয়: এটি একটি ভুল ধারণা। স্ট্রোক যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে।
- স্ট্রোক বংশগত নয়: বংশগত কারণেও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
- স্ট্রোক প্রতিরোধ করা যায় না: সঠিক জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব।
স্ট্রোকের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি
বর্তমানে স্ট্রোকের চিকিৎসায় অনেক আধুনিক পদ্ধতি এসেছে, যা দ্রুত রোগীকে সুস্থ করতে সাহায্য করে।
কিছু আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি
- থ্রম্বোলাইসিস: জমাট বাঁধা রক্ত গলানোর জন্য এই চিকিৎসা করা হয়।
- এন্ডোভাসকুলার থেরাপি: রক্তনালী থেকে জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণ করার জন্য এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
- ব্রেইন সার্জারি: মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে বা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দিলে সার্জারি করা হয়।
ফ্রিকোয়েন্টলি আস্কড কোয়েশ্চন্স (FAQ)
এখানে কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো, যা স্ট্রোক নিয়ে মানুষের মনে প্রায়ই দেখা যায়:
১. স্ট্রোক হলে কত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা উচিত?
স্ট্রোক হলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা শুরু করা উচিত। প্রথম ঘণ্টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়টাকে ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। দ্রুত চিকিৎসা শুরু করলে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমানো যায় এবং রোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়।
২. মহিলারা কি স্ট্রোকের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন?
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে মহিলাদের মধ্যে স্ট্রোকের ঝুঁকি কিছুটা বেশি হতে পারে, বিশেষ করে গর্ভাবস্থা, হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (HRT), এবং জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল ব্যবহারের কারণে। তবে, পুরুষ এবং মহিলা উভয়ের জন্যই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো জরুরি।
৩. স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক কি একই জিনিস?
স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক দুটোই মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা, কিন্তু এ দুটো এক নয়। স্ট্রোক হয় মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে, অন্যদিকে হার্ট অ্যাটাক হয় হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে। দুটো ক্ষেত্রেই দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন, তবে কারণ এবং চিকিৎসা পদ্ধতি ভিন্ন।
৪. স্ট্রোকের পরে কি স্মৃতিভ্রম হতে পারে?
হ্যাঁ, স্ট্রোকের পরে স্মৃতিভ্রম (memory loss) একটি সাধারণ সমস্যা। স্ট্রোক মস্তিষ্কের যে অংশে আঘাত করে, তার ওপর নির্ভর করে স্মৃতিভ্রমের তীব্রতা কেমন হবে। পুনর্বাসন এবং থেরাপির মাধ্যমে স্মৃতিশক্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা যেতে পারে।
৫. স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে খাদ্য তালিকায় কী পরিবর্তন আনা উচিত?
স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে খাদ্য তালিকায় কিছু পরিবর্তন আনা উচিত। যেমন:
- ফল ও সবজির পরিমাণ বাড়ানো
- কম চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ করা
- লবণ ও চিনি কম খাওয়া
- প্রক্রিয়াজাত খাবার (processed foods) পরিহার করা
- পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা
এই পরিবর্তনগুলো আপনার হৃদরোগ এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমিয়ে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হবে।
6. স্ট্রোক কি পুরোপুরি সেরে যায়?
হ্যাঁ, অনেক রোগী ঠিকমতো ফিজিওথেরাপি ও ওষুধে সুস্থ হয়ে ওঠেন।
- মাথাব্যথা কি স্ট্রোকের লক্ষণ?
হঠাৎ তীব্র মাথাব্যথা, বিশেষ করে অন্য লক্ষণ থাকলে, তা স্ট্রোকের ইঙ্গিত হতে পারে।
শেষ কথা
স্ট্রোক একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হলেও সচেতনতা ও সঠিক জীবনযাত্রার মাধ্যমে এর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই, নিজের প্রতি যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন এবং অন্যকেও উৎসাহিত করুন। মনে রাখবেন, আপনার একটু সচেতনতাই বাঁচাতে পারে একটি জীবন।
আপনার সচেতনতাই হতে পারে আপনার প্রিয়জনের জীবনরক্ষার কারণ — তথ্যগুলো শেয়ার করুন, জানিয়ে দিন অন্যদেরও।

BSES+Advance Nutritionist