কিডনি রোগীদের জন্য কিছু ফল হলো আপেল, পেয়ারা, নাশপাতি, পেঁপে, কমলা, আনারস, আঙুর, স্ট্রবেরি, ব্লুবেরি, ক্র্যানবেরি, তরমুজ, বরই, পীচ, চেরি এবং লেবু। এই ফলগুলি সাধারণত কিডনি রোগীদের জন্য নিরাপদ এবং তাদের খাদ্য তালিকায় যোগ করা যেতে পারে।
কিডনি রোগের সাথে মানিয়ে চলা কঠিন, আর খাবারের তালিকা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে। ফল খাওয়া নিয়েও অনেকের মনে সংশয় থাকে – কিডনি রোগী কি কি ফল খেতে পারবে? এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর নিয়েই আমাদের আজকের আলোচনা।
আমরা জানবো, কোন ফলগুলো আপনার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর, যা শরীরকে শক্তি যোগাবে এবং সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, কিছু ফল সম্পর্কে সতর্কও করব যা কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এই লেখায় আমরা কিডনিবান্ধব ফলের তালিকা দেব, যা আপনাকে আপনার ডায়েট সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
কিডনি রোগী কি কি ফল খেতে পারবে?
কিডনি রোগীদের ফল খাওয়ার বিষয়ে কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। কোন ফলগুলো খাওয়া যাবে আর কোনগুলো এড়িয়ে চলতে হবে, তা নির্ভর করে রোগীর কিডনি রোগের পর্যায়, রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা এবং ফলটিতে পটাশিয়াম ও অক্সালেটের পরিমাণের ওপর। তবে সাধারণত কম পটাশিয়ামযুক্ত ফল কিডনি রোগীদের জন্য নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়।
- এখানে ১৫ টি ফলের তালিকা দেওয়া হল যা কিডনি রোগীরা খেতে পারেন:
- আপেল: আপেলে ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে যা কিডনির জন্য ভালো।
- পেয়ারা: পেয়ারায় ভিটামিন সি এবং ফাইবার থাকে।
- নাশপাতি: নাশপাতিতে ফাইবার এবং ভিটামিন কে রয়েছে।
- পেঁপে: পাকা পেঁপেতে ভিটামিন এ এবং সি থাকে।
- কমলা: কমলাতে ভিটামিন সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায়।
- আনারস: আনারসে ভিটামিন সি এবং ম্যাঙ্গানিজ থাকে।
- আঙ্গুর: আঙুরে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি থাকে।
- স্ট্রবেরি: স্ট্রবেরিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ভিটামিন সি থাকে।
- ব্লুবেরি: ব্লুবেরিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।
- ক্র্যানবেরি: ক্র্যানবেরি কিডনির জন্য উপকারী।
- তরমুজ: তরমুজে জলের পরিমাণ বেশি থাকে যা কিডনির জন্য ভালো।
- বরই: বরই ভিটামিন সি সমৃদ্ধ একটি ফল।
- পীচ: পীচে ভিটামিন এ এবং সি থাকে।
- চেরি: চেরিতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে।
- লেবু: লেবুতে সাইট্রিক অ্যাসিড থাকে যা কিডনিতে পাথর প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে।
এই ফলগুলো সাধারণত কিডনি রোগীদের জন্য নিরাপদ এবং তাদের খাদ্যতালিকায় যোগ করা যেতে পারে। তবে, মনে রাখবেন, প্রতিটি রোগীর অবস্থা ভিন্ন হতে পারে, তাই যেকোনো ফল খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। তারাই আপনার স্বাস্থ্যের অবস্থা অনুযায়ী সঠিক নির্দেশনা দিতে পারবেন।
কিডনি রোগীদের জন্য ফল নির্বাচনের সময় কিছু বিষয় মনে রাখতে হবে:
- ফল নির্বাচনে পটাশিয়াম এবং ফসফরাসের পরিমাণ বিবেচনা করা উচিত।
- ডায়ালাইসিস রোগীদের জন্য ফল নির্বাচন করার সময় বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
- ফল খাওয়ার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
- ফলগুলি পরিমাণে অল্প করে খাওয়া উচিত।
- কিছু ফল, যেমন খুবানি, কিডনি রোগীদের জন্য এড়িয়ে যাওয়া উচিত কারণ এতে উচ্চ পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে।
কোন ফলগুলো কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকারক?
কিডনি রোগীদের জন্য কিছু ফল ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ এগুলোতে পটাসিয়াম, ফসফরাস বা অক্সালেট-এর পরিমাণ বেশি থাকে। এই উপাদানগুলো শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে যদি কিডনি সঠিকভাবে ফিল্টার করতে না পারে। নিচে ১০টি ফলের নাম ও তার ব্যাখ্যা দেওয়া হলো:
১. কলা: কলায় প্রচুর পরিমাণে পটাসিয়াম থাকে, যা কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। পটাসিয়াম শরীরে বেশি পরিমাণে জমা হলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
২. কমলা ও কমলালেবুর রস: এই ফলগুলোতেও পটাসিয়াম বেশি থাকে। কিডনি রোগীদের জন্য এগুলো পরিহার করা উচিত।
৩. তরমুজ: যদিও তরমুজে পানির পরিমাণ বেশি, এটি পটাসিয়ামের একটি ভালো উৎস, তাই এটি অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়।
৪. আনারস: আনারসে অক্সালেট থাকে, যা কিডনিতে পাথর তৈরি করতে পারে। যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস আছে, তাদের জন্য এটি ক্ষতিকর হতে পারে।
৫. আলুবোখারা: আলুবোখারায় পটাসিয়াম এবং অক্সালেট উভয়ই বেশি পরিমাণে থাকে, যা কিডনির জন্য ক্ষতিকর।
৬. কিউই: কিউই তে পটাসিয়াম এবং অক্সালেট দুটোই বেশি থাকে, তাই এটি কিডনি রোগীদের জন্য উপযুক্ত নয়।
৭. এপ্রিকট: এপ্রিকটে পটাসিয়াম এবং ভিটামিন সি বেশি থাকে, যা কিডনি রোগীদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
৮. খেজুর: খেজুরে প্রচুর পরিমাণে চিনি এবং পটাসিয়াম থাকে, যা কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
৯. কিসমিস: কিসমিসে পটাসিয়াম এবং চিনি দুটোই বেশি থাকে, তাই এটি কিডনি রোগীদের জন্য এড়িয়ে চলা উচিত।
১০. ড্রাগন ফল: যাদের কিডনিতে পাথর হওয়ার ইতিহাস আছে, তাদের জন্য ড্রাগন ফল পরিমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত, কারণ এতে অক্সালেট থাকে।
কিডনি রোগীর সুষম খাদ্যাভ্যাস কেমন হওয়া উচিত?
কিডনি রোগী কি কি ফল খেতে পারবে বা কিডনি রোগীদের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমে কিডনির কার্যকারিতা উন্নত করা এবং রোগের অগ্রগতি কমানো সম্ভব। তাদের খাদ্যতালিকায় প্রোটিন, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, ফসফরাস এবং তরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কিডনি রোগীদের সুষম খাদ্যাভ্যাসের মূল দিকগুলো
- পরিমিত প্রোটিন: অতিরিক্ত প্রোটিন কিডনির ওপর চাপ ফেলে, তাই এর পরিমাণ সীমিত করা প্রয়োজন। মাছ, মুরগি, ডিম এবং মটরশুঁটি, ডাল, সয়াবিনের মতো উদ্ভিজ্জ প্রোটিন পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করা যেতে পারে।
- কম সোডিয়াম: উচ্চ সোডিয়ামযুক্ত খাবার যেমন ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত ও লবণাক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন। খাবারে বাড়তি লবণ যোগ করা থেকে বিরত থাকুন।
- পরিমিত পটাসিয়াম: কলা, আলু, টমেটো, এবং কমলালেবুর মতো উচ্চ পটাসিয়ামযুক্ত খাবার সীমিত করতে হবে। সবুজ শাকসবজি ও অন্যান্য ফল থেকে পটাসিয়ামের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- কম ফসফরাস: দুগ্ধজাত খাবার, মাংস এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারে ফসফরাস বেশি থাকে। তাই এগুলো সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করা উচিত।
- পর্যাপ্ত জল পান: কিডনি রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত জল পান জরুরি হলেও, তরলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। কারণ অতিরিক্ত তরল কিডনির উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
- ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার: ফল, শাকসবজি এবং গোটা শস্যের মতো ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার কিডনির কার্যকারিতা বাড়াতে সাহায্য করে।
- কম চিনিযুক্ত খাবার: সোডা এবং ফলের রসের মতো চিনিযুক্ত পানীয় সীমিত করা উচিত।
- কম চর্বিযুক্ত খাবার: মাংস, ভাজা খাবার এবং ফাস্ট ফুড যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
- নিয়মিত খাদ্য তালিকা অনুসরণ: একজন ডাক্তার বা ডায়েটিশিয়ানের সঙ্গে পরামর্শ করে আপনার জন্য একটি উপযুক্ত খাদ্য তালিকা তৈরি করুন এবং সেটি নিয়মিত অনুসরণ করুন।
সময় | খাবার | বিবরণ |
সকাল | রুটি/ভাত, ডিম, সবজি, পানীয় | ১টি সেদ্ধ ডিম (সাদা অংশ) অথবা ১/২ কাপ দুধ (কম ফ্যাটযুক্ত)। |
মধ্য সকাল | ফল | ১টি ছোট আপেল বা ১/২ কাপ পেয়ারা/নাশপাতি (খোসা ছাড়ানো)। |
দুপুর | ভাত, মাছ/মুরগি, ডাল, সবজি | ১-১.৫ কাপ সাদা ভাত। ছোট এক টুকরা মাছ (যেমন: রুই, কাতলা, পাঙ্গাস) অথবা মুরগির বুকের মাংস (চামড়াবিহীন, সেদ্ধ বা হালকা ঝোল)। ১/২ কাপ পাতলা মসুর ডাল (খুব অল্প পরিমাণে লবণ ব্যবহার করুন)। ১ কাপ কম পটাসিয়ামযুক্ত সবজি (যেমন: বাঁধাকপি, পটল, শসা, গাজর)। |
বিকাল | মুড়ি/চিঁড়ে, ফল | ১/২ কাপ মুড়ি বা চিঁড়ে। ১/২ কাপ স্ট্রবেরি বা আঙুর। |
রাত | ভাত/রুটি, মাছ/মুরগি, সবজি, সালাদ | ১ কাপ সাদা ভাত অথবা ১-২টি ছোট রুটি। ছোট এক টুকরা মাছ বা মুরগির বুকের মাংস (দুপুরের মতো)। ১/২ কাপ কম পটাসিয়ামযুক্ত সবজি। শসা, গাজর (কাঁচা, সীমিত পরিমাণে) সালাদ হিসেবে। |
ঘুমানোর আগে | জল | ১-২টি ছোট রুটি (আটা/ময়দার) বা ১ কাপ সাদা ভাত। ১টি সেদ্ধ ডিমের সাদা অংশ। ১/২ কাপ কম পটাসিয়ামযুক্ত সবজি (যেমন: লাউ, শসা, চিচিঙ্গা) হালকা তেলে ভাপানো বা সেদ্ধ। ১ কাপ চা (দুধ ছাড়া) বা জল। |
কিডনি রোগীদের জন্য ফল: কখন সাবধান হবেন?

ফল আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী, কিন্তু কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে ফল খাওয়ার সময় একটু বাড়তি যত্ন নিতে হয়। সঠিক সতর্কতা মেনে চললে কিডনি রোগীরাও ফলের পুষ্টিগুণ উপভোগ করতে পারবেন এবং সুস্থ থাকতে পারবেন। চলুন জেনে নিই কিছু জরুরি টিপস:
ফল খাওয়ার সময় কিডনি রোগীদের বিশেষ সতর্কতা
- পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবার আগে: ফল খাওয়ার আগে অবশ্যই ভালো করে ধুয়ে নিন। এতে ফলের গায়ে লেগে থাকা ময়লা, রাসায়নিক বা জীবাণু দূর হয়ে যাবে, যা আপনার কিডনির জন্য নিরাপদ।
- বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন: সব ফল সবার জন্য উপযুক্ত নয়। আপনার কিডনির অবস্থা বুঝে কোন ফল আপনার জন্য ভালো, তা জানতে একজন ডায়েটিশিয়ান বা কিডনি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। তিনিই আপনাকে সবচেয়ে সঠিক নির্দেশনা দিতে পারবেন।
- একবারে বেশি নয়, অল্প অল্প করে খান: হুট করে একগাদা ফল না খেয়ে, সারা দিনে অল্প অল্প করে ভাগ করে খান। এতে আপনার শরীর ফলের পুষ্টিগুণ ভালোভাবে শোষণ করতে পারবে এবং কিডনির ওপর চাপও কম পড়বে।
- ডায়াবেটিস থাকলে সাবধান: যদি আপনার ডায়াবেটিস থাকে, তাহলে মিষ্টি ফল খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন। কিছু ফল রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা কিডনি রোগীদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
- পটাশিয়াম ও ফসফরাস জেনে কিনুন: কিডনি রোগীদের জন্য পটাশিয়াম এবং ফসফরাসের মাত্রা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি রোগী কি কি ফল খেতে পারবে বা ফল কেনার আগে বা খাওয়ার আগে জেনে নিন কোন ফলে এই উপাদানগুলো কতটা আছে। উচ্চ পটাশিয়াম বা ফসফরাসযুক্ত ফল এড়িয়ে চলুন বা খুবই সীমিত পরিমাণে খান।
এই ছোট ছোট সতর্কতাগুলো মেনে চললে কিডনি রোগীরাও নিরাপদে ফলের স্বাদ নিতে পারবেন এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে পারবেন।
শেষ কথা
কিডনি রোগীদের জন্য ফল খাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তবে তা হতে হবে জেনে বুঝে। মনে রাখবেন, কিডনি রোগী কি কি ফল খেতে পারবে তা নির্ভর করে রোগের পর্যায় এবং ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের ওপর। সঠিক ফল নির্বাচন আর পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করে কিডনি রোগীরাও ফলের পুষ্টিগুণ উপভোগ করতে পারেন এবং সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। কোনো ফল খাওয়ার আগে আপনার চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে ভুলবেন না।

BSES+Advance Nutritionist