হিট স্ট্রোকের প্রধান লক্ষণ হলো শরীরের তাপমাত্রা ১০৪°F (৪০°C) বা তার বেশি হয়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা, বমি, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, ও অজ্ঞান হয়ে পড়া। দ্রুত ঠান্ডা পরিবেশে নিয়ে গিয়ে শরীর ঠান্ডা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আহ, গরম! বাংলাদেশে গরম পড়া মানেই যেন ঘামে ভেজা শরীর, ক্লান্তি আর অসহ্য অস্বস্তি। সূর্যের তীব্র তাপে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর ভয়ংকর প্রভাব পড়ে।
এই গরমেই দেখা দেয় সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা—হিট স্ট্রোক। অনেকে ভাবেন এটা কেবল রোদে কাজ করা বা খেলোয়াড়দের সমস্যা, কিন্তু আসল কথা হলো—আমরা সবাই ঝুঁকিতে আছি।
হিট স্ট্রোক কোনও সাধারণ অস্বস্তি নয়, এটা একটি জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা। ঠিক সময়ে চিকিৎসা না পেলে বিপদ বড় হতে পারে। কিন্তু ভয় নয়, সচেতনতা আর সঠিক জ্ঞানই আমাদের রক্ষা করবে।
আজকের এই লেখায় আমরা জানবো হিট স্ট্রোকের লক্ষণ, প্রতিকার আর প্রতিরোধ।
চলুন, তাহলে গরমে সুস্থ থাকার এই গুরুত্বপূর্ণ যাত্রায় আমরা একসাথে পা বাড়াই!
হিট স্ট্রোক কী?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, হিট স্ট্রোক হলো শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের প্রাকৃতিক ক্ষমতার সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়া। আমাদের শরীর একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় (সাধারণত ৯৮.৬° ফারেনহাইট বা ৩৭° সেলসিয়াস) কাজ করে।
যখন বাইরের তাপমাত্রা খুব বেশি হয় এবং শরীর নিজেকে ঠান্ডা করতে পারে না, তখন ভেতরের তাপমাত্রা বিপদজনকভাবে বেড়ে যায়। এই অবস্থাকেই আমরা হিট স্ট্রোক বলি।
এটি একটি মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি, কারণ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যেমন মস্তিষ্ক, কিডনি, হার্ট এবং পেশী কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে।
জাতীয় রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (CDC) অনুসারে, প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ হিট স্ট্রোকের শিকার হয়। এর মধ্যে অনেকেই মারা যায়। সঠিক সচেতনতা ও প্রতিরোধে এই সংখ্যা কমানো সম্ভব।
হিট স্ট্রোক কেন হয়?
হিট স্ট্রোকের প্রধান কারণ হলো দীর্ঘক্ষণ ধরে উচ্চ তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার মধ্যে থাকা। তবে এর পেছনে আরও কিছু কারণ কাজ করে, যা আমাদের জানা দরকার:
- তীব্র গরমে দীর্ঘক্ষণ থাকা: ধরুন, আপনি দুপুরে কড়া রোদে মাঠে কাজ করছেন বা দীর্ঘক্ষণ বাইরে ঘোরাঘুরি করছেন। এতে আপনার শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যেতে পারে।
- পর্যাপ্ত পানি পান না করা: গরমে শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান না করা হয়, তাহলে শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়।
- ভারী শারীরিক পরিশ্রম: তীব্র গরমে ভারী ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম করলে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়।
- আঁটসাঁট পোশাক: গরমে সিন্থেটিক বা আঁটসাঁট পোশাক পরলে বাতাস চলাচল করতে পারে না, ফলে শরীর সহজে ঠান্ডা হতে পারে না।
- কিছু নির্দিষ্ট ঔষধ: কিছু ঔষধ আছে যা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে, যেমন অ্যান্টিহিস্টামিন, ডিহাইড্রেশন সৃষ্টিকারী ঔষধ ইত্যাদি।
- বয়স: শিশু এবং বয়স্ক ব্যক্তিরা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন, কারণ তাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কম কার্যকর হয়।
- শারীরিক অসুস্থতা: হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কিডনি রোগের মতো কিছু ক্রনিক রোগ থাকলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।
ফোরাম অভিজ্ঞতা থেকে:
“আমার বাবা বাজারে গিয়ে ঘন্টাখানেক রোদে ছিলেন। হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যান। ডাক্তার বলেন হিট স্ট্রোক। এখন বুঝি রোদে সাবধানে থাকতে হয়।” – রুবেল, ময়মনসিংহ।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও উপসর্গ (Signs and Symptoms of Heat Stroke)
শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি বেড়ে যায়, ঘাম বন্ধ হয়ে যায়, মাথা ঘোরে, ক্লান্ত লাগে, কথা জড়িয়ে যায়, এমনকি অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো চেনা অত্যন্ত জরুরি, কারণ দ্রুত ব্যবস্থা নিলে জীবন বাঁচানো সম্ভব। লক্ষণগুলো সাধারণত ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে পারে, তাই শুরু থেকেই সতর্ক থাকা উচিত।
প্রাথমিক লক্ষণ (হিট এক্সহশন)
হিট স্ট্রোক হওয়ার আগে শরীর সাধারণত কিছু সংকেত দেয়, যা হিট এক্সহশন (Heat Exhaustion) নামে পরিচিত। এই পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতে পারলে হিট স্ট্রোক এড়ানো সম্ভব।
- শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম বের হওয়া।
- অস্বাভাবিক ক্লান্তি এবং শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করা।
- হালকা থেকে তীব্র মাথাব্যথা এবং হিট স্ট্রোকের লক্ষণ ও প্রতিকার: জীবন বাঁচাতে এই তথ্য জানাটা জরুরিমাথা ঘোরা অনুভব করা।
- পেটে অস্বস্তি এবং বমি হওয়ার প্রবণতা।
- হাত, পা বা পেটের পেশীতে ব্যথা বা টান ধরা।
- ত্বক ঠান্ডা এবং ভেজা অনুভব হওয়া, যদিও শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা বাড়ছে।
- শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত হওয়া।
- শরীরের তাপমাত্রা ১০০.৪° ফারেনহাইট (৩৮° সেলসিয়াস) থেকে ১০৪° ফারেনহাইট (৪০° সেলসিয়াস) পর্যন্ত হতে পারে।
হিট স্ট্রোক হলে বুঝবেন কীভাবে? গুরুতর লক্ষণ
যখন হিট এক্সহশনের লক্ষণগুলো উপেক্ষা করা হয় এবং শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তখন হিট স্ট্রোক হয়। এই লক্ষণগুলো দেখলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
- শরীরের তাপমাত্রা ১০৪° ফারেনহাইট (৪০° সেলসিয়াস) বা তার বেশি: এটি হিট স্ট্রোকের প্রধান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
- ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া: ত্বক শুষ্ক এবং গরম হয়ে যাওয়া, কারণ শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। (তবে কিছু ক্ষেত্রে ঘাম হতেও পারে, বিশেষ করে কঠোর পরিশ্রমের কারণে হিট স্ট্রোক হলে)।
- বিভ্রান্তি, অস্থিরতা বা অস্বাভাবিক আচরণ: রোগী এলোমেলো কথা বলতে পারে, অস্থিরতা বা বিরক্তি প্রকাশ করতে পারে।
- খিঁচুনি: মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার কারণে খিঁচুনি হতে পারে।
- জ্ঞান হারানো বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: রোগী অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে বা সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে।
- দ্রুত ও শক্তিশালী হৃদস্পন্দন: হৃদপিণ্ড দ্রুত এবং জোরে স্পন্দিত হতে থাকে।
- গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস: শ্বাস-প্রশ্বাস অস্বাভাবিক গভীর বা দ্রুত হতে পারে।
- লাল, গরম ত্বক: রক্তনালী প্রসারিত হওয়ার কারণে ত্বক লাল এবং উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এই লক্ষণগুলো দেখলে এক মুহূর্তও দেরি না করে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।”যখনই শরীর ঘাম ছাড়ে না এবং মাথা ঘোরে, সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা পরিবেশে যান। দেরি করলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।” – ডা. কামরুল ইসলাম, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।
হিট স্ট্রোকের চিকিৎসা
হিট স্ট্রোক একটি জরুরি অবস্থা। সঠিক সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।
হিট স্ট্রোক হলে ঘরে বসে করণীয় – প্রাথমিক চিকিৎসার ধাপসমূহ
১. রোগীকে ঠান্ডা স্থানে সরান: দ্রুত রোগীকে সরাসরি সূর্যের আলো থেকে সরিয়ে কোনো ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যান। সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে (এসি রুম) বা ফ্যানের নিচে রাখুন।
২. পোশাক আলগা করুন: রোগীর শরীরের আঁটসাঁট পোশাক খুলে দিন বা আলগা করে দিন, যাতে শরীরের তাপমাত্রা সহজে কমাতে পারে।
৩. শরীর ঠান্ডা করুন:
- রোগীর শরীরে ঠান্ডা পানি ঢালুন বা ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিন।
- বগল, কুঁচকি এবং ঘাড়ের নিচে বরফের টুকরা (যদি থাকে) রাখুন। এই জায়গাগুলোতে রক্তনালী ত্বকের কাছাকাছি থাকে, তাই দ্রুত ঠান্ডা হতে সাহায্য করে।
- ফ্যান বা পাখা দিয়ে বাতাস করুন, যাতে শরীর থেকে তাপ দ্রুত বের হয়ে যায়।
৪. পানি পান করান (যদি সচেতন থাকে): যদি রোগী সচেতন থাকে এবং বমি বমি ভাব না থাকে, তাহলে তাকে অল্প অল্প করে ঠান্ডা পানি বা ইলেক্ট্রোলাইট সমৃদ্ধ পানীয় (যেমন স্যালাইন) পান করান। তবে অজ্ঞান বা বমি বমি ভাব থাকলে জোর করে পানি পান করাবেন না, এতে শ্বাসরোধের ঝুঁকি থাকে।
৫. পা উঁচু করে শুইয়ে দিন: রোগীকে চিৎ করে শুইয়ে পা সামান্য উঁচু করে দিন, এতে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ বাড়বে।
প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন বা রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালে চিকিৎসা
হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক রোগীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে নিম্নলিখিত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারেন:
- শরীরের তাপমাত্রা কমানো: ডাক্তাররা রোগীর তাপমাত্রা দ্রুত কমানোর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যেমন ইন্ট্রাভেনাস (IV) ফ্লুইড, কোল্ড ওয়াটার ইমারশন (ঠান্ডা পানিতে ডুবানো) বা কোল্ড কম্বল।
- ডিহাইড্রেশন মোকাবিলা: শিরায় স্যালাইন বা ফ্লুইড দিয়ে শরীরের পানিশূন্যতা দূর করা হয়।
- অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ: কিডনি, হার্ট এবং মস্তিষ্কের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজনে সাপোর্ট দেওয়া হয়।
- জটিলতা ব্যবস্থাপনা: যদি খিঁচুনি বা অন্য কোনো জটিলতা দেখা দেয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ বা চিকিৎসা প্রদান করা হয়।
হিট স্ট্রোক প্রতিরোধের উপায়

প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। কিছু সহজ পদক্ষেপ অনুসরণ করে আমরা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারি।
১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
- নিয়মিত পানি পান: তৃষ্ণা না পেলেও নিয়মিত বিরতিতে পানি পান করুন। গরমের দিনে দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করা উচিত।
- ইলেক্ট্রোলাইট যুক্ত পানীয়: ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় লবণ বেরিয়ে যায়। তাই ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ওরস্যালাইন পান করতে পারেন।
- ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল পরিহার: চা, কফি, কোমল পানীয় এবং অ্যালকোহল শরীরকে ডিহাইড্রেট করে, তাই এগুলো পরিহার করুন।
২. পোশাক নির্বাচন
হালকা রঙের, সুতির বা লিনেন কাপড়ের ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। এই ধরনের পোশাক বাতাস চলাচল করতে সাহায্য করে এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখে।
সিন্থেটিক বা গাঢ় রঙের পোশাক অতিরিক্ত তাপ শোষণ করে এবং শরীরকে গরম করে তোলে।
৩. দিনের বেলায় সতর্কতা
সূর্যের আলো এড়িয়ে চলুন। দুপুর ১২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সূর্যের তাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। এই সময়ে বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন। যদি বের হতেই হয়, তাহলে ছাতা, টুপি বা স্কার্ফ ব্যবহার করুন।
সম্ভব হলে দিনের উষ্ণতম সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বা ঠান্ডা পরিবেশে থাকুন। দিনে একাধিকবার ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করুন বা ভেজা গামছা দিয়ে শরীর মুছুন।
৪. খাদ্যাভ্যাস
গরমে সহজে হজম হয় এমন হালকা খাবার খান। ভাজাপোড়া, গুরুপাক খাবার এড়িয়ে চলুন। পানি সমৃদ্ধ ফল ও সবজি যেমন শসা, তরমুজ, বাঙ্গি, টমেটো ইত্যাদি বেশি করে খান। সঙ্গে ওরস রাখলেন তো? নাহলে বিপদ।
৫. শারীরিক পরিশ্রম
যদি ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম করতেই হয়, তাহলে সকালের দিকে বা সন্ধ্যার পরে করুন যখন তাপমাত্রা কম থাকে। দীর্ঘক্ষণ পরিশ্রম করলে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিন এবং শরীরকে ঠান্ডা করুন।
অন্যদের প্রতি খেয়াল রাখুন
- শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর: শিশু এবং বয়স্করা হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিতে বেশি থাকেন। তাদের পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করুন এবং তারা যেন ঠান্ডা পরিবেশে থাকেন, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
- পোষা প্রাণী: পোষা প্রাণীদেরও হিট স্ট্রোক হতে পারে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করুন এবং ছায়াযুক্ত স্থানে রাখুন।
হিট স্ট্রোক এবং হিট এক্সহশনের মধ্যে পার্থক্য
হিট স্ট্রোক এবং হিট এক্সহশন প্রায় একই রকম মনে হলেও এদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। এই পার্থক্য জানা থাকলে সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হবে।
বৈশিষ্ট্য | হিট এক্সহশন (Heat Exhaustion) | হিট স্ট্রোক (Heat Stroke) |
গুরুত্ব | কম গুরুতর, প্রাথমিক সতর্ক সংকেত | অত্যন্ত গুরুতর, জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন |
শরীরের তাপমাত্রা | সাধারণত ১০৪° ফারেনহাইট (৪০° সেলসিয়াস) এর নিচে থাকে | ১০৪° ফারেনহাইট (৪০° সেলসিয়াস) বা তার বেশি |
ঘাম | প্রচুর ঘাম হয়, ত্বক ঠান্ডা ও ভেজা থাকে | ঘাম বন্ধ হয়ে যেতে পারে (তবে কিছু ক্ষেত্রে ঘাম হতেও পারে), ত্বক গরম ও শুষ্ক থাকে |
মানসিক অবস্থা | ক্লান্তি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, পেশীতে টান | বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, অস্বাভাবিক আচরণ, খিঁচুনি, জ্ঞান হারানো |
প্রাথমিক চিকিৎসা | ঠান্ডা স্থানে বিশ্রাম, পোশাক আলগা করা, পানি পান করানো, শরীর ঠান্ডা করা | দ্রুত ঠান্ডা স্থানে নেওয়া, পোশাক আলগা করা, শরীর ঠান্ডা করা, অবিলম্বে হাসপাতালে নেওয়া |
চিকিৎসা ফল | সাধারণত দ্রুত সুস্থ হয়ে যায় | চিকিৎসা না পেলে অঙ্গহানি বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে |
World Health Organization (WHO) রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১২৫,০০০ মানুষ হিট স্ট্রোকে মারা যান। CDC (USA) বলছে, গ্রীষ্মে প্রতিদিন ৭০০+ হিট স্ট্রোক কেসে হাসপাতালে ভর্তি হয়।
উপসংহার
গরমে হাঁসফাঁস করা এখন যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু একটু সচেতন হলেই হিট স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী বিপদ এড়ানো সম্ভব। এটা শুধু মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা নয়—এটা এক জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা।
সময়মতো লক্ষণ চিনতে পারা আর সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অনেক বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তাই আমরা যেন নিজে সতর্ক থাকি, আর প্রিয়জনদেরও সচেতন করি।
আপনার পাশে কেউ যদি হিট স্ট্রোকের লক্ষণে ভোগেন, দেরি না করে তৎক্ষণাৎ সাহায্য করুন। আপনার একটি সিদ্ধান্ত কাউকে মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
যদি মনে করেন, এই তথ্য কারও জীবন বাঁচাতে পারে—তাহলে আর দেরি না করে এখনই শেয়ার করুন। আপনি হতে পারেন কারও সুপারহিরো—শুধু একটা ক্লিকেই।
প্রশ্নোত্তর (FAQ): হিট স্ট্রোক নিয়ে সবার জিজ্ঞাসা
১. হিট স্ট্রোক কতক্ষণে হয়?
মাত্র ১০ থেকে ৩০ মিনিটেই হিট স্ট্রোক হতে পারে। গরমে শরীর যদি ঘাম না ছাড়ে বা পানি না পান করেন, তাহলে শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে যায়। বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে রোদে থাকলে, এই সময়ের মধ্যেই হিট স্ট্রোক হতে পারে।
২. হিট স্ট্রোক থেকে সুস্থ হতে কত সময় লাগে?
সাধারণত ২ থেকে ৭ দিন সময় লাগে। যদি সময়মতো চিকিৎসা পান, তবে বেশিরভাগ মানুষ এক সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, দুর্বলতা বা ঘুমের সমস্যা আরও কিছুদিন থাকতে পারে।
৩. হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি কাদের বেশি?
শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী এবং যাদের ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ আছে। এদের শরীর সহজে তাপ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই তারা গরমে খুব সহজে হিট স্ট্রোকের শিকার হয়। গৃহকর্মী, রিকশাচালক, কৃষক—এদের ঝুঁকি বেশি।
৪. শিশুদের হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো কি বড়দের থেকে আলাদা হয়?
হ্যাঁ, অনেক সময় লক্ষণগুলো স্পষ্ট হয় না।
শিশুদের ক্ষেত্রে তারা কান্নাকাটি করতে পারে, খাবারে অরুচি দেখাতে পারে, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যেতে পারে। মুখ শুকিয়ে যায় এবং তারা খুব চুপচাপ হয়ে পড়ে। তাই বাবা-মায়েদের খুব সচেতন থাকতে হবে।
৫. হিট স্ট্রোকের পর কি কোনো দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা দেখা দিতে পারে?
হ্যাঁ, যদি দেরি হয়, তাহলে মস্তিষ্ক, কিডনি বা হৃদপিণ্ডে সমস্যা হতে পারে। হিট স্ট্রোকের কারণে শরীরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেউ কেউ স্মৃতিভ্রষ্টতা, ঘুমের সমস্যা বা মনোযোগে ঘাটতির মতো সমস্যায় ভোগেন।

BSES+Advance Nutritionist