আলসার সাধারণত ২ থেকে ৮ সপ্তাহে ভালো হয়, তবে এটি নির্ভর করে রোগীর শারীরিক অবস্থা, আলসারের ধরণ, জীবনযাত্রা ও চিকিৎসার ধরনের উপর। সঠিক ওষুধ, খাবার, ও অভ্যাস মানলে পেটের ঘা ভালো হতে বেশি সময় লাগে না।
আলসার নিয়ে মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খায়, তাই না?
আসলে আলসার কী, কেন হয়, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – আলসার কত দিনে ভালো হয়?
যারা নিজেরাই এই সমস্যায় ভুগছেন, কিংবা যাদের কাছের কেউ আক্রান্ত, তাদের মনে প্রতিদিনই আসে এই প্রশ্ন।
খালি পেটে ব্যথা, বুক জ্বালা? খাওয়া দায়? মনে হচ্ছে গ্যাস্ট্রিক—but এটা যদি আলসার হয়?
বেশিরভাগ মানুষ ঠিক বুঝতে পারে না। ভুল ওষুধ, ভুল অভ্যাস — আর তাতেই বাড়ে ঝুঁকি।
এই লেখায় জানবেন, আলসার কী, কত দিনে ভালো হয়, কীভাবে দ্রুত সারে, আর কখন ডাক্তার দেখাবেন।
আলসার আসলে কী?
এটি হজমতন্ত্রের দেয়ালে তৈরি হওয়া ক্ষত, যা অ্যাসিডের জন্য হয়।
সহজ কথায়, আলসার হলো আমাদের হজমতন্ত্রের ভেতরের দেয়ালে তৈরি হওয়া ক্ষত। এই ক্ষত সাধারণত পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র বা খাদ্যনালীতে দেখা যায়। যখন অ্যাসিডের পরিমাণ বেড়ে যায় আর প্রতিরক্ষামূলক স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখনই এই ক্ষত তৈরি হয়।
ভাবুন তো, আপনার পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালটা একটা নরম চামড়ার মতো। যদি এই চামড়ায় কোনো কারণে আঘাত লাগে বা এটা ছিঁড়ে যায়, তাহলে সেটাকে আমরা আলসার বলতে পারি।
আলসারের লক্ষণ
আলসারের সাধারণ লক্ষণ হলো পেটের উপরের দিকে জ্বালাপোড়া বা ব্যথা, যা খালি পেটে বাড়ে। খাবার খেলেই সাময়িক আরাম মেলে।
আরও লক্ষণ হলো বুক জ্বালা, ঢেঁকুর, বমি বমি ভাব, গা গুলানো, এমনকি কালো পায়খানা। অনেক সময় ক্ষুধা কমে যায় এবং ওজন কমতে থাকে। রাতে ব্যথা বেশি হয়।
কেউ কেউ ভাবেন গ্যাস্ট্রিক, কিন্তু এগুলো আলসারের প্রাথমিক সিগন্যাল।
আলসারের প্রধান কারণগুলো কী কী?
আলসারের পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। সবচেয়ে পরিচিত কারণগুলোর মধ্যে দুটি হলো:
- হেলিকোব্যাক্টর পাইলোরি (H. pylori) নামক ব্যাকটেরিয়া: এই ব্যাকটেরিয়া পেটে বাসা বাঁধলে আলসার হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
- ব্যথানাশক ঔষধের অতিরিক্ত ব্যবহার: জ্বর বা ব্যথা হলে অনেকেই ব্যথানাশক খেয়ে ফেলেন। সেটা ক্ষতি করে। যেমন, অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা নেপ্রোক্সেন। এই ঔষধগুলো নিয়মিত বা অতিরিক্ত খেলে পাকস্থলীর ভেতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা আলসারের কারণ হয়।
ডাঃ আনোয়ার হোসেন (MBBS, FCPS) বলেন, “৯০% আলসার হয় ব্যাকটেরিয়া (H. pylori) অথবা ওষুধের (NSAIDs) কারণে।”
এছাড়াও, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ধূমপান, মদ্যপান এবং মশলাদার খাবারও আলসার হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আলসার কত দিনে ভালো হয়?
২–৮ সপ্তাহে ভালো হয়, তবে চিকিৎসা ও লাইফস্টাইল ঠিক রাখতে হয়।
আলসার কত দিনে ভালো হবে, তা নির্ভর করে অনেকগুলো বিষয়ের ওপর। এটা এক দিনে বা এক সপ্তাহে ঠিক হয়ে যাওয়ার মতো কোনো সমস্যা নয়। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা, ধৈর্য এবং জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা।
- আলসারের ধরন ও চিকিৎসার প্রভাব
আলসারের ধরন অনুযায়ী সুস্থ হতে লাগা সময়টা ভিন্ন হতে পারে।
১.১ গ্যাস্ট্রিক আলসার (পাকস্থলীর আলসার)
গ্যাস্ট্রিক আলসার পাকস্থলীর ভেতরের দেয়ালে হয়। এই আলসার সাধারণত ভালো হতে ৪ থেকে ৮ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। যদি H. pylori ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়, তাহলে অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্স সম্পন্ন করার পাশাপাশি অ্যাসিড কমানোর ঔষধও খেতে হয়।
১.২ ডিওডেনাল আলসার (ক্ষুদ্রান্ত্রের আলসার)
ডিওডেনাল আলসার ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশে হয়। এই ধরনের আলসার সাধারণত গ্যাস্ট্রিক আলসারের চেয়ে দ্রুত ভালো হয়। সাধারণত, ৬ থেকে ১২ সপ্তাহ সময়ের মধ্যে এটি সেরে যায়। H. pylori-এর কারণে হলে এখানেও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা লাগে।
১.৩ খাদ্যনালীর আলসার (Esophageal Ulcer)
এই আলসার খাদ্যনালীতে হয়, যা সাধারণত গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের কারণে ঘটে। এটি ভালো হতেও ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে, তবে ক্ষেত্রবিশেষে আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
- জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাস
শুধু ঔষধ খেলেই হবে না, আপনার জীবনযাপন এবং খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে। এগুলো আলসার দ্রুত ভালো হতে সাহায্য করে।
- ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ: এই দুটো অভ্যাস আলসারকে আরও খারাপ করে তোলে এবং সুস্থ হতে বেশি সময় নেয়।
- মানসিক চাপ কমানো: মানসিক চাপ আলসারের লক্ষণগুলোকে বাড়িয়ে দেয়। তাই চাপ কমানোর জন্য মেডিটেশন বা যোগব্যায়াম করতে পারেন।
- খাদ্যাভ্যাস: মশলাদার খাবার, অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার, সাইট্রাস ফল, কফি এবং সোডা পানীয় পরিহার করা উচিত। হালকা, সহজপাচ্য খাবার খাওয়া উচিত।
আলসার কত দিনে ভালো হয় একটি সম্ভাব্য সময়সীমা সারাংশ টেবিল আকারে দিলাম যাতে সহজে বুঝতে পারেন ।
আলসারের প্রকার | চিকিৎসার ধরন | সম্ভাব্য সুস্থতার সময়কাল |
গ্যাস্ট্রিক আলসার | অ্যান্টিবায়োটিক + অ্যাসিড কমানোর ঔষধ | ৪-৮ সপ্তাহ |
ডিওডেনাল আলসার | অ্যান্টিবায়োটিক + অ্যাসিড কমানোর ঔষধ | ৬-১২ সপ্তাহ |
খাদ্যনালীর আলসার | অ্যাসিড কমানোর ঔষধ | ৬-৮ সপ্তাহ |
ব্যথানাশক ঔষধজনিত আলসার | ঔষধ বন্ধ + অ্যাসিড কমানোর ঔষধ | ২-৪ সপ্তাহ |
গুরুত্বপূর্ণ কথা: মনে রাখবেন, এই সময়সীমাগুলো কেবল একটি ধারণা মাত্র। আপনার আলসার কত দিনে ভালো হবে, তা নির্ভর করে আপনার ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থা, আলসারের তীব্রতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আপনি কতটা নিয়ম মেনে চলছেন তার ওপর।
ডাঃ রুবিনা পারভীন (গ্যাস্ট্রোলোজিস্ট) জানান, “যদি ওষুধ নিয়মিত খাওয়া হয়, তো এক মাসেই পেটে আলসার শুকিয়ে যায়।”
আলসারের চিকিৎসায় ঘরোয়া টিপস (ডাক্তারের পরামর্শসহ)
ডাক্তারের পরামর্শে নিচের কিছু টিপস অনুসরণ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়—
- খালি পেটে চা খাবেন না
- ছোট ছোট ৫–৬ বার খাবার খান
- গ্যাস তৈরি হয় এমন খাবার এড়ান
- পানির পরিমাণ বাড়ান
- ধূমপান একদম বাদ দিন
আলসার কি পুরোপুরি ভালো হয়?
হ্যাঁ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আলসার পুরোপুরি ভালো হয়ে যায়, যদি সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাপন পদ্ধতি মেনে চলা হয়।
তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলসার বারবার ফিরে আসতে পারে, বিশেষ করে যদি H. pylori ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণরূপে নির্মূল না হয় অথবা যদি ব্যথানাশক ঔষধের ব্যবহার বন্ধ না হয়।
আলসার ভালো হওয়ার লক্ষণগুলো কী কী?
যখন আপনার আলসার ভালো হতে শুরু করবে, তখন কিছু লক্ষণ দেখে আপনি বুঝতে পারবেন:
- পেটে ব্যথা কমে যাওয়া: এটি সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ। আপনার পেটের জ্বালাপোড়া বা ব্যথা ধীরে ধীরে কমে আসবে।
- বমি বমি ভাব বা বমি কমে যাওয়া: আলসারের কারণে অনেকের বমি বমি ভাব বা বমি হয়। এটি ভালো হলে এই সমস্যাগুলোও কমে যাবে।
- ক্ষুধা বৃদ্ধি: আলসারের কারণে অনেকের ক্ষুধা কমে যায়। সুস্থ হতে থাকলে ক্ষুধা ফিরে আসবে।
- ঘুমের উন্নতি: পেটে ব্যথার কারণে ঘুমের সমস্যা হয়। আলসার ভালো হলে ঘুমও ভালো হবে।
- কালো পায়খানা না হওয়া: যদি আপনার মল কালো বা আলকাতরার মতো হয়, তবে এটি অভ্যন্তরীণ রক্তপাতের লক্ষণ হতে পারে। আলসার ভালো হলে এই সমস্যা থাকবে না।
আলসার ভালো হওয়ার পর কী করবেন না?
- ওষুধ হঠাৎ বন্ধ করা
- আগের ভুল অভ্যাসে ফিরে যাওয়া
- নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া
- রেগে থাকা, স্ট্রেস না কমানো
“আলসার ফেরত আসার মূল কারণ হলো—পুরনো ভুলে ফিরে যাওয়া।” – ডাঃ ফারজানা আক্তার
আলসার হলে কী কী খাওয়া উচিত এবং এড়িয়ে চলা উচিত?
আলসার হলে খাবারের দিকে বিশেষ নজর দিতে হয়। কিছু খাবার আলসারকে aggravated করে, আবার কিছু খাবার আলসার ভালো হতে সাহায্য করে।
যে খাবারগুলো আলসার ভালো হতে সাহায্য করে:
- উচ্চ ফাইবারযুক্ত খাবার: যেমন, ওটস, আপেল, নাশপাতি, মটরশুঁটি। এই খাবারগুলো হজমে সাহায্য করে এবং অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- দুগ্ধজাত পণ্য: দই, ছানা, পনির ইত্যাদি হজমে সাহায্য করে।
- নরম ও সহজপাচ্য খাবার: যেমন, সেদ্ধ আলু, নরম ভাত, সেদ্ধ সবজি, মাছের পাতলা ঝোল।
- প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ খাবার: দই বা কিমচি (যদি সহ্য হয়) প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া সরবরাহ করে, যা হজমতন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
- আদা: আদা হজমশক্তি বাড়ায় এবং বমি বমি ভাব কমাতে সাহায্য করে।
- কলা: কলা একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টাসিড হিসেবে কাজ করে এবং পাকস্থলীর ভেতরের আবরণকে সুরক্ষা দেয়।
যে খাবারগুলো এড়িয়ে চলা উচিত:
- মশলাদার খাবার: অতিরিক্ত ঝাল বা মশলা আলসারের ব্যথা বাড়াতে পারে।
- অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার: এগুলি হজমে সমস্যা করে।
- সাইট্রাস ফল: কমলা, লেবু, জাম্বুরা জাতীয় ফল অ্যাসিডের মাত্রা বাড়াতে পারে।
- কফি ও চা: এগুলিতে ক্যাফেইন থাকে, যা অ্যাসিড উৎপাদন বাড়ায়।
- কার্বনেটেড পানীয় (সোডা): এই পানীয়গুলো গ্যাস তৈরি করে এবং পেটে অস্বস্তি বাড়ায়।
- অ্যালকোহল: অ্যালকোহল পাকস্থলীর আবরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
- টমেটো ও টমেটো সস: এগুলিতে অ্যাসিড থাকে, যা আলসারের ব্যথা বাড়ায়।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবেন?
যদি আপনার আলসারের লক্ষণগুলো তীব্র হয় বা নিচের কোনো লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত:
- তীব্র পেটে ব্যথা, যা কিছুতেই কমছে না।
- রক্ত বমি হওয়া বা কালো কফির গুঁড়োর মতো বমি হওয়া।
- কালো বা আলকাতরার মতো পায়খানা হওয়া।
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া।
- খাবার গিলতে অসুবিধা হওয়া।
এই লক্ষণগুলো গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজন।
আলসার কি ক্যান্সার হতে পারে?
সাধারণত, আলসার ক্যান্সার নয়। তবে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে গ্যাস্ট্রিক আলসার যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং সঠিকভাবে চিকিৎসা না করা হয়, তাহলে তা ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই সঠিক সময়ে আলসারের চিকিৎসা করানো খুবই জরুরি। যদি আপনার আলসার ভালো হতে দেরি হয় অথবা বারবার ফিরে আসে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শে বায়োপসি বা এন্ডোস্কোপি করিয়ে নেওয়া ভালো।
আলসার প্রতিরোধে কিছু টিপস
আলসার একবার হয়ে গেলে তা সারিয়ে তোলা যেমন জরুরি, তেমনি ভবিষ্যতে যেন আলসার না হয়, তার জন্য কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়াও দরকার।
- স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: সুষম ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করুন।
- ধূমপান ও মদ্যপান ত্যাগ: এই দুটো অভ্যাস আলসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ: যোগব্যায়াম, মেডিটেশন বা পছন্দের কোনো কাজ করে মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
- ব্যথানাশক ঔষধের ব্যবহার সীমিত করুন: ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত ব্যথানাশক ঔষধ খাবেন না।
- পর্যাপ্ত ঘুম: পর্যাপ্ত ঘুম আপনার শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
- H. pylori ব্যাকটেরিয়ার পরীক্ষা: যদি আপনার পরিবারে আলসারের ইতিহাস থাকে, তাহলে H. pylori ব্যাকটেরিয়ার জন্য পরীক্ষা করিয়ে নিতে পারেন।
গর্ভাবস্থায় আলসার: মা ও শিশুর জন্য কতটা বিপজ্জনক?
গর্ভাবস্থায় আলসার হলে মা ও শিশুর উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি হয়, বিশেষ করে যদি তা অবহেলা করা হয়। এই সময়ে হরমোনের পরিবর্তন, অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যাওয়া, খাওয়াদাওয়ার পরিবর্তন এবং স্ট্রেস—সব মিলিয়ে আলসার হওয়ার ঝুঁকি অনেকটা বেড়ে যায়।
অনেকে মনে করেন গ্যাস্ট্রিক সমস্যা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে সেটি পেপটিক আলসার বা ডুওডেনাল আলসার হয়ে যেতে পারে।
এই ক্ষত থেকে রক্তপাত, রক্তশূন্যতা, এমনকি মা ও শিশুর পুষ্টিহীনতা পর্যন্ত হতে পারে। আলসার যদি বেড়ে যায়, তবে রক্ত বমি, কালো পায়খানা অথবা পেট ফেঁটে যাওয়ার (perforation) মতো মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে।
ডাঃ ফারহানা তাসনিম (গাইনী বিশেষজ্ঞ) বলেন: “গর্ভাবস্থায় আলসার থাকলে তা শুধু মায়ের নয়, গর্ভের শিশুরও পুষ্টি ও ওজন কমিয়ে দিতে পারে।”
প্রেগন্যান্সিতে এমন কিছু ওষুধ আছে যা নিরাপদ, যেমন অ্যান্টাসিড বা সুক্রালফেট। তবে প্রথম তিন মাসে বেশি ওষুধ এড়ানো উচিত। নিজে থেকে কিছু খেলে ক্ষতি হতে পারে। এ কারণে চিকিৎসক দেখানো ছাড়া কিছু করা যাবে না।
এই সময়ে খাবার ঠিক রাখা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, মানসিক প্রশান্তি ও নিয়মিত ফলোআপ অত্যন্ত জরুরি। কারণ গর্ভকালীন যেকোনো ব্যথা উপেক্ষা করলেই হতে পারে বড় ক্ষতি।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQs)
১. আলসার হলে কি দুধ খাওয়া যাবে?
দুধ সাময়িকভাবে পেটের জ্বালাপোড়া কমাতে সাহায্য করলেও, এটি পাকস্থলীতে অ্যাসিড উৎপাদন বাড়াতে পারে। তাই আলসার হলে দুধ সম্পূর্ণভাবে পরিহার করা উচিত নয়, তবে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো। আপনি চাইলে দই বা ছানা খেতে পারেন, যা প্রোবায়োটিক সমৃদ্ধ এবং হজমে সাহায্য করে।
২. আলসারের ব্যথার জন্য কোন ঔষধ ভালো?
সাধারণত, আলসারের ব্যথার জন্য প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরস (PPIs) যেমন – ওমিপ্রাজল, ইসোমিপ্রাজল, প্যান্টোপ্রাজল ইত্যাদি ঔষধ ব্যবহার করা হয়। এই ঔষধগুলো পাকস্থলীতে অ্যাসিড উৎপাদন কমিয়ে ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। তবে, অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন করা উচিত।
৩. আলসার কি বংশগত রোগ?
আলসার সরাসরি বংশগত রোগ নয়, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলসার হওয়ার পারিবারিক প্রবণতা দেখা যায়। যদি আপনার পরিবারের কারো আলসার থাকে, তাহলে আপনার আলসার হওয়ার ঝুঁকি সামান্য বাড়তে পারে। বিশেষ করে H. pylori ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে।
৪. আলসার হলে কি ওজন কমে যায়?
হ্যাঁ, আলসার হলে অনেকের ওজন কমে যেতে পারে। ব্যথার কারণে খাবার খেতে অনীহা, বমি বমি ভাব, এবং হজমের সমস্যার কারণে পুষ্টি শোষণ কমে যায়। এর ফলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ওজন কমতে শুরু করে। যদি আপনার ওজন হঠাৎ করে কমে যায়, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
৫. আলসার হলে কি নিয়মিত কফি পান করা ঠিক?
না, আলসার হলে নিয়মিত কফি পান করা ঠিক নয়। কফিতে থাকা ক্যাফেইন পাকস্থলীতে অ্যাসিড উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়, যা আলসারের ব্যথা এবং জ্বালাপোড়া আরও বাড়াতে পারে। তাই আলসার থাকলে কফি, চা এবং অন্যান্য ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় পরিহার করা উচিত।
শেষ কথা
আলসার কোনো সাধারণ ব্যথা নয়। তবে আলসার একটি কষ্টদায়ক সমস্যা হলেও, সঠিক ওষুধ, খাবার, ঘুম আর অভ্যাস মানলেই এটি এক মাসেই ভালো হয়।
তবে দেরি করলে সময় লাগবে বেশি। ব্যথা লুকাবেন না। উপসর্গ দেখলেই ভয় না পেয়ে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী চলুন। আপনার সুস্থতা আপনার হাতেই! তাই এখনই সময় যত্ন নিন।
এই লেখা যদি আপনার কাজে লেগে থাকে, তাহলে একবার শেয়ার করুন। কারণ, একটিমাত্র ক্লিক কাউকে হাসপাতালের বিছানায় যেতে বাঁচাতে পারে।

BSES+Advance Nutritionist